image1 image1 image1

অপাঙ্কতেয় ভালবাসা

রিফাত ডিনার শেষ করে লিভিং রুমের সোফায় বসে আইপ্যাড থেকে বাংলা নাটকের ইউটিউব ভিডিও টিভি’র পর্দায় দেখছে। কোন নাটকই রিফাত পুরাটা দেখে না। নাটকের মাঝখানেই নাটক বদালিয়ে ফেলেডিজিটাল যুগে টিভি’র অনুষ্ঠান নিজের নিয়ন্ত্রনে থাকার এই এক বিশাল সুবিধাইচ্ছে করলেই টিভি’র সাবজেক্ট চেন্জ করা যায়। বিজ্ঞাপনের ঝামেলা পোহাতে হয় না। এক টানে এক ঘন্টার অনুষ্ঠান পনের মিনিটেই শেষ করা যায়। প্রায় পনের/কুড়ি বছর ধরে রিফাত তার অভিবাসী জীবনে বাংলাদেশের কোন নাটকই খুব একটা দেখে না। ভাল লাগে না। কিন্তু হঠাৎ করে গত এক সপ্তাহ ধরে রিফাতের পরিবর্তন লক্ষ্য করছে স্ত্রী নিলা। প্রতিদিনই ৭/৮ টা বাংলা নাটক দেখে এক বসায়। অবশ্য কোন নাটকই পুরা শেষ করে না।

আজকে কেন যেন রিফাত একটা নাটক খুব বেশী মনযোগ সহকারে আদ্যপান্ত দেখছে। শুধু তাই নয় নাটকের মাঝখানের বিজ্ঞাপনগুলোও টানছে না। নাটকের সিকোয়েন্সগুলোতে মাঝে মধ্যে বেশ মন্তব্যও করছে। পরের সিকোয়েন্সে কি হতে যাচ্ছে বা কি ডায়ালগ দেয়া হবে তাও বেশ ঠিক ঠিক বলছে। দেখে মনে হবে নাটকটা রিফাতেরই লেখা। রিফাতের এই পরিবর্তন দেখে পাশে বসে থাকা নিলার একটু বিরক্ত-ই বোধ হচ্ছে। অবশ্য নিলাও যে নাটক দেখছে তা নয়। নিলা সাচারাচর টিভি দেখেনা, শোনে। তার মানে এই নয় নিলা অন্ধ। ফেসবুক চালু হবার পর থেকে নিলা’র দৈনিন্দন অবসরের পুরা সময়টাই সম্ভবত ফেসবুক দখলে নিয়েছে। রিফাতের এতে ভাল না লাগলেও নিলা’র সাথে বেশী একটা লাগতে যায় না। টিভি সেটের সামনে বসে ল্যাপটপে ফেসবুক করাটা নিলার নিত্য দিনের অবসরের কাজ। তার আগে ছিল ব্লগ। যখনই রিফাত নিলার দিকে চোখ দেয় তখনই দেখে নিলা তার পেন্সিলের মত চিকন চাকন ইন্ডেক্স আঙ্গুল দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা একবার স্ক্রল আপ করছে আবার স্ক্রল ডাউন করছে। টাচস্ক্রিন ল্যাপটপে এই এক সুবিধা। মাঝে মধ্যে কিছু টাইপ করে। রিফাত খুব একটা লক্ষ্য করে না কোথায় কি লেখালেখি নিলা করছেরিফাত আবার মানুষের ব্যাক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অনেকগুলো ব্লগ ও ফেসবুকে নিলা ও রিফাত উভয়-ই ট্যাগ থাকার কারনে নিলার সব পোষ্ট রিফাতের টাইম লাইনে একসময় দেখতে পেলেও এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। “নিলা কি লেখা লেখি ছেড়ে দিয়েছে?” নাহ! তাকে তো রিফাত প্রায়ই লিখতে দেখে। তাহলে নিলা সে লেখাগুলো কোথায় পোষ্ট করে যা রিফাতের টাইম লাইনে আর দেখা যায় না? রিফাতের মনে প্রায়ই এ প্রশ্ন জাগে। কিন্তু নিলাকে জিজ্ঞাসা করে না। কারন সেটা আবার ব্যাক্তি স্বাধীনতা’র ব্যাপারে রিফাতের নীতি নয়। নিলার এ ধরনের আসক্তিতে রিফাত একসময় বলতো “সোসাল মিডিয়া দেখছি তোমাকে ডাইলের মত নেশায় ফেলেছে”। নিলা প্রায়ই রিফাতের এ ধরনের মন্তব্যে একটু অসস্তিতে পড়তো আর তা নিয়ে ছোট খাট একটা লেকচার দিয়ে দিত। এখন রিফাত আর সেটাও করে না। কি দরকার কারোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা। তাছাড়া লেখালেখি করাটা একটা ভাল প্রতিভাও বটে। কেন তার প্রতিভার বাতিকে রিফাত নিভাতে যাবে। বরং তার প্রতিভার বাতিকে আরো জ্বালাতে সাহায্য করবে। এটাই না স্ত্রীর প্রতি একজন অনুগতশীল স্বামীর ভালবাসার কর্তব্য। মাঝে মাঝে নিলা দু একটা লেখা রিফাতকে দেয় ঠিক ঠাক করে দেয়ার জন্য। রিফাতও বেশ সানন্দে তা পরিমার্জিত করে দেয়। নিলাও খুশি হয়। রিফাতেরও ভাল লাগে। নিলা’র খুশি মুখ রিফাতের বরাবরই ভাল লাগে।

রিফাত ও নিলা’র প্রায় ২৬ বছরের বিরামহীন বিবাহিত যাযাবরের জীবন। যাযাবর এজন্য যে রিফাত ও নিলা ক্যারিয়ারের কারনে উভয়ই দুনিয়ার অনেক দেশে ঘুড়েছে এই ২৬ বছরে, কিন্তু কোথাও স্থায়ী কোন স্থাবর সম্পদ গড়তে পারেনি। গত ১২ বছর ধরে আমেরিকায় স্থায়ী অভিবাসী হলেও ক্যারিয়ারের কারনে একেক সময় একেক স্টেটে চাকরী পরিবর্তন করতে হয় ওদের। কাজেই স্থাবর সম্পদ সেখানেও গড়ে উঠেনি তাদের জন্য। নিলার বাবা, রিফাতের শ্বশুর তাই একবার আক্ষেপ করে ওদের বলেছিলেন “তোমাদের সংসার কি আজীবন যাযাবরের মত স্যুটকেস বন্দী হয়েই থাকবে? চড়ুই পাখির মত উড়া উড়ি বাদ দিয়ে এবার কোথাও একটু স্থায়ী হও”। নিলার বাবা আজ প্রায় ১৫ বছর আগে চলে গেছেন যেদিন নিলা ও রিফাত দু’জনই পোষ্ট-পিএইচডি করার জন্য ২য় বারের মত দেশ ত্যাগ করে। আজো ওদের স্থায়ী হওয়া হলো না। পরস্পর ভালবেসেই তাদের বিয়ে হয়েছিল। একুশ বছরের একটি পুত্র সন্তানও আছে তাদের। পেশায় মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রিফাত নিলা থেকে এক বছরের সিনিয়র ক্লাসের ছাত্র ছিল। নিলা ছিল তুখর বুদ্ধিমতি অসাধারন ক্যারিয়ার পিয়াসি ছাত্রী। অনার্স ক্লাসে’র প্রতি বছরে ১ম শ্রেনীতে প্রথম স্থান পাওয়া ছাত্রী নিলাএক নামে ক্যাম্পাসে সবাই তাকে চিনতো। নিলার এই পরিচিতি এখনো আছে। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখনো অনেক জুনিয়র সিনিয়র’রা তাকে ফেসবুকে খুঁজে পায়অনেকে আবার ফোনও করে কালেভদ্রে। নিলার এই পরিচিতি রিফাতের ভালই লাগে। রিফাত কখনও এজন্য হিনমন্নতায় ভোগে না। বরং প্রাউড বোধ করে। নিলার মধ্যে তেমন কোন আত্ন অহঙ্কারের আভাস কখনও কেউ লক্ষ্য করেনি। সে তুলনায় রিফাত বুদ্ধিমান ও দায়িত্ববান হলেও ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত বাচাল প্রকৃতির একজন এ্যাভারেজ রেজাল্টের দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্র। নিলা খুবই সাবলিল এবং স্বল্প ভাষিনী স্বভাবেরক্যাম্পাসের সব রকম অনুষ্ঠানে নিলাকে দেখা যেত বন্ধুদের সাথে বেশ জমসে আড্ডা দিতে। নিলা যখন ক্যাম্পাসে ২য় বর্ষের ছাত্রী তখন থেকেই রিফাতের চোখে পড়ে নিলা। রিফাত বিভিন্ন ভাবে নিলা’র নজরে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রিফাতের রেজাল্ট নিলা’র মত চৌকশ কিছু না। ক্যারিয়ারিষ্ট চৌকশ টপ ক্লাস রেজাল্টের ছাত্রী’র ভালবাসা পেতে হলে যে রিফাতকেও সমপর্যায়ের ছাত্র হতে হবে সেটা রিফাত শুরুতেই বুঝে নিয়েছে। কিন্তু কি আর করা, ভালবাসা বলে তো কথাদেখা যাক না ট্রাই করে, রিফাতের পালহীন নৌকোকে ভালবাসার হাওয়ার দোলায় নিলা নদীর তীরে ভিড়ানো যায় কিনা। যদি থাকে নসিবে। রিফাত যখন অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র তখন একদিন সাহস করে নিলাকে তার ভালবাসার কথাটা বলেই ফেল্লো। নিলা সেদিন কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে বহুদিন রিফাত আর নিলার মুখোমুখি হয়নি এ বিষয়েনিজের কাছে খুব অপাঙ্কতেয় মনে হচ্ছিল রিফাতের।

আজ রিফাত খুব মনযোগ সহকারে টিভির পর্দায় বাংলাদেশের একটা সিরিয়াল নাটকের ইউটিউব ভিডিও দেখছে। পাশে বসে নিলা বুঝতে পাচ্ছে না রিফাত কেন এত মনযোগ দিয়ে নাটকটা দেখছে? মাঝে মাঝে রিফাতের দিকে আড়ি চোখে তাকালেও আবার তার ল্যাপটপে মনযোগ দেয় নিলা। নিলা লক্ষ্য করে রিফাত নাটকটির প্রতিটা সিকোয়েন্স আর ডায়ালগ উপভোগ করছে। মম আর অপূর্বের অভিনিত একটা নাটক দেখছে রিফাতএত প্রানবন্ত অভিনয়, রিফাতের কাছে মনে হচ্ছে বাস্তব। অভিনেত্রী মম আমেরিকা প্রবাসী রিফাতের এক বন্ধুর আত্নিয়া হবার সুবাদে সে বন্ধু’র চাপাচাপিতেই সম্ভবত রিফাত মম’র নাটকটাই দেখার জন্য সিলেক্ট করেছিলএই প্রথম রিফাত মম’র কোন নাটক দেখছে। একেকটা পর্ব রিফাত দুইবার করে দেখছে। অবশ্য পর্বগুলো ১৫ মিনিটের লম্বা হওয়াতে সুবিধা। প্রতিটা ডায়ালগ কান পেতে শুনার চেষ্টা করছে। ভিডিও’র কোয়ালিটির কারনে সাউন্ডে সমস্যা হচ্ছে। রিফাতকে তাই মাঝে মাঝেই উঠে গিয়ে অডিওগ্রামের সাউন্ড সিস্টেমকে কাষ্টমাইজ করতে হচ্ছে ম্যানুয়ালী, রিমোটে কাজ হচ্ছে না বলেসাউন্ড ঠিক করার পর আবার রিজুইম করে নাটক দেখছে সে, যাতে কোন কিছু বাদ না যায়। রিফাতের কেবলই মনে হচ্ছে এই নাটকটাতে যেন তার জীবনের ভালবাসা পর্বের কাহিনীই বলছে। রিফাতের স্বপ্নের মত করে অবিকল ঠিক একই অভিব্যাক্তিই যেন রিফাত এই নাটকে মম আর অপূর্বের অভিনয়ের মধ্যে লক্ষ্য করছে। রিফাতের কেবলই মনে হচ্ছে এ যেন তারই কথা। কাজেই নিজের ভেতরটাকে আরো ভাল করে দেখতে হবে। নিজের ভেতরটাকে তো আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। তাছাড়া মম/অপূর্ব জুটির অসাধারন প্রেমের অভিনয়ে নিলা/রিফাতের দুই যুগ আগের ভালবাসা’র অনুভূতিকে ফিরে দেখাও একটা আনন্দের। রিফাত বলতে গেলে নাটকের মধ্যে যেন নিজেকেই খুঁজে নিয়েছে। এতকিছু সত্যিই পাশে বসা যে কারোর বিরক্তির কারন হবে নিশ্চিত। নিলাও কোন ব্যাতিক্রম না। এক পর্যায়ে নিলা বিরক্ত হয়ে বলেই ফেল্লো “কি পেয়েছ তুমি এই নাটকে? এত ক্রেজী হয়ে দেখছো? ইট রিয়েলি লুকস অড”কথাটা বলেই নিলা আবার তার ল্যাপটপে মননিবেশ করলো। রিফাত বুঝতে পারলো নিলা কি মিন করছে।

দেহের মধ্যে হৃদয় নামের যে একটা বস্তু আছে সেখানে প্রচন্ড একটা চাপ অনুভব করলো রিফাতরিফাত চিন্তাও করেনি নিলা এই ২৬ বছরের বৈবাহিক জীবনে এভাবে তাকে ট্রিট করবেরিফাত কোন কথা না বলে ফ্রিজ থেকে একটা আইসক্রিম বের করে খেতে থাকে আর নিজেকে নিজেই কুল করার চেষ্টা করেরিফাত বুঝতে পারছে সোসাল মিডিয়াতে যেভাবেই হোক নিলার প্রতিভার বাতি এখন প্রচন্ড বেগে জ্বলছে। চারদিক তার এখন আলোকিত উদ্ভাসিত আলোকময় প্রতিভা জ্বল জ্বল করে জ্বলছেবিখ্যাত হবার বাসনা তাকে হয়তোেশাগ্রস্থ করে ফেলেছে। যার কারনে রিফাতকে এখন তার জ্বলন্ত বাতির নিচে উড়ে আসা অপাঙ্কতেয় পতঙ্গ মনে হতেই পারে রিফাত কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা নিজের ঘরে শুয়ে পড়ে আর গুন গুন করে নাটকের থিম গানের দুটি চরন গাইতে থাকে

“স্বপ্ন জড়ানো রাতের হাওয়ায়,

নির্জনে ভাবছি তোমায়”।

joomla templatesfree joomla templatestemplate joomla
2016  Kortoa